• মঙ্গলবার ( রাত ৪:৫৮ )
  • ৪ঠা আগস্ট ২০২০ ইং

» ১৭ রমযান ঐতিহাসিক বদর যুদ্ধের প্রেরণাদীপ্ত ঈমানী চেতনার স্মারক..

প্রকাশিত: ১১. মে. ২০২০ | সোমবার

◑হাফেজ মুহাম্মদ আবুল মঞ্জুরঃ
আজ ঐতিহাসিক ১৭ রমযান। মাহে রমযানের অপরাপর মোবারক দিনের উর্ধ্বেও ইসলামের ইতিহাসে এই দিনটি অনন্য বৈশিষ্ট্য ও চেতনায় ভাস্বর। ইসলামের ইতিহাসে প্রথম সত্য-মিথ্যা পার্থক্যকারী যুদ্ধ, ইসলামের অস্থিত্ব রক্ষার প্রথম রক্তক্ষরা মহাসংগ্রাম বদরের যুদ্ধের প্রেরণাদীপ্ত চেতনার স্মারক ১৭ রমযান। রমযানের রোযা ফরয হয়েছে দ্বিতীয় হিজরি সনে। আর সে বছরই ১৭ রমযান সংঘটিত হয়েছে ঐতিহাসিক বদরের যুদ্ধ। এজন্য দিনটিকে বদর দিবসও বলা হয়ে থাকে। মহানবী হযরত মুহাম্মদ সা. নবুওয়াত প্রাপ্তির পর দীর্ঘ ১৩ বছর অতিবাহিত করেন মক্কাতুল মোকাররমায়। এরপর তিনি আল্লাহর হুকুমে মক্কায় বসবাসরত সাহাবিদের নিয়ে পর্যায়ক্রমে মদিনায় হিজরত করেন। হিজরতের দ্বিতীয় বছরেই নবীজী সা. এর নেতৃত্বে গঠিত মদিনা রাষ্ট্রটি মক্কার কাফের শক্তির পক্ষ থেকে হুমকির সম্মুখিন হয়। সিরিয়া থেকে ফেরার পথে মক্কার কাফেরদের একটি বাণিজ্য কাফেলা মুসলিম শক্তির প্রতিরোধের মুখে পড়ার খবর ছড়িয়ে পড়লে মক্কার এক হাজার কাফের সেনার একটি সশস্ত্র দল মদিনা থেকে ৮০ মাইল দূরে অবস্থিত বদর ময়দানে এসে যুদ্ধ প্রস্তুতি শুরু করে। এ অবস্থায় সত্যের পক্ষে মাত্র ৩১৩ জন নিরস্ত্র সাহাবী যোদ্ধা (যাদের মধ্যে মক্কা থেকে আসা মুহাজির ও মদিনায় বসবাসরত আনসাররা ছিলেন) বদর ময়দানের আরেক পাশে উপস্থিত হন। সঙ্গে দু’টি ঘোড়া, ৭৯টি উট আর যুদ্ধে ব্যবহারের জন্য অল্প কয়েকটি ঢাল-তরবারি।

অপরদিকে সশস্ত্র ১ হাজার যোদ্ধা মিথ্যার পক্ষে। তাদের নিয়ন্ত্রণে একশ’টি ঘোড়া আর ৭’শটি উট। যুদ্ধটি বিপুলভাবে অসম হলেও বিকাশমান মুসলিম শক্তির জন্য এ ছিল অস্তিত্ব রক্ষার এক মহাসংগ্রাম। এ যুদ্ধে আল্লাহ তা’আলার শ্রেষ্ঠতম দূত মহানবী সা. আল্লাহর দরবারে মুনাজাতে মগ্ন হয়ে পড়েন। হৃদয় উজাড় করে সাহায্যের আবেদন করতে থাকেন। আবেগ, কাতরতা, আর ভুবনজয়ী চেতনা থেকে তিনি মুনাজাত করে বলেন, এ যুদ্ধে মুসলমানদের এই ছোট্ট দলটি পরাজিত হলে আল্লাহকে স্মরণ করার লোক দুনিয়ায় থাকবে না। প্রিয়তম হাবিবের ডাকে সাড়া দিয়ে মাওলায়ে কারিম মুসলমানদের অভূতপূর্ব বিজয় দান করেন। এ যুদ্ধে সাহাবি যোদ্ধা শহীদ হন ১২ থেকে ১৪ জন আর কাফেরদের মধ্যে উৎবা, শাইবা, আবু জেহেলের মতো শীর্ষ কাফেরসহ প্রায় ৭০ জন নিহত হয়। বন্দি হয় আরও ৭০ জন।

বদর যুদ্ধের অভূতপূর্ব বিজয়ে মুসলমানদের ভিত দৃঢ়তর হয়। এরপরও মক্কায় কাফের ও মদিনার ইহুদিদের সঙ্গে মক্কা বিজয় পর্যন্ত উহুদ, খন্দক, খয়বরের মতো আরও ক’টি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে মুসলমানদের নামতে হয় বাধ্য হয়ে। রাসূল সা. এর জীবদ্দশায় মক্কা বিজয়ের পরও আরও কয়েকটি যুদ্ধ সংঘটিত হয়। কিন্তু ইসলামের ইতিহাসে দ্বিতীয় হিজরির ১৭ রমযানে সংঘটিত বদর যুদ্ধের তাৎপর্য সবসময়ই অনন্য মহিমায় ভাস্বর হয়ে আছে। বদর যুদ্ধের মুজাহিদ সাহাবিদের সবসময়ই গণ্য করা হয় সবচেয়ে মর্যাদাবান শ্রেণী হিসেবে।

ইসলামের অস্তিত্বের প্রথম সকালে ধেয়ে আসা অন্ধকারের ঝড়ের মুখে আত্মনিবেদনের যে উজ্জ্বল অনুশীলন বদরের প্রান্তরে সাহাবিরা করেছেন, তাঁর সঙ্গে রামাযানের আত্মনিয়ন্ত্রণ, সংযম,আল্লাহর হুকুমের সামনে আত্মবিসর্জনের অপূর্ব এক সাদৃশ্য বিদ্যমান। রক্ত ও মৃত্যুর বিভীষিকা যে জিহাদের মূল চিত্র ও চেতনা নয়, বদরের প্রান্তরে মুনাজাতে কান্না, যুদ্ধকালে রোযা রেখে ক্ষুধার্ত থাকা আর শান্তি ও সত্য প্রতিষ্ঠায় প্রত্যয় ধরে রাখার মধ্যে ‘বদর যুদ্ধ’ তার এক উজ্জ্বল মানবিক রূপ উপহার দিয়েছে। রমযান মনুষ্যত্ব ও আল্লাহর দাসত্বকে, অস্তিত্বে ধারণ এবং লালন করার যে শিক্ষা দিয়ে যায় সেই আত্মশুদ্ধি, আত্মনিয়ন্ত্রণ, ধৈর্য, সাধনা, সেবা, আল্লাহর দরবারে আবেদন, আত্মনিবেদন ও সংগ্রামের সব অধ্যায় যে একই সূত্রে গাথা তার এক মহান স্বাক্ষর দ্বিতীয় হিজরির এই ১৭ রমযান। বদর দিবসের এই সামগ্রিক শিক্ষা ও চেতনা বিকশিত হোক প্রত্যেক মুসলমানের অন্তর ও জীবনে।

লেখক :
খতীব
শহীদ তিতুমীর ইনস্টিটিউট জামে মসজিদ,
সদর, কক্সবাজার।

ফেসবুক থেকে কমেন্ট করুন।
Share Button

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ১১৯ বার

Share Button