• মঙ্গলবার ( ভোর ৫:৩৮ )
  • ৪ঠা আগস্ট ২০২০ ইং

» বিশ্ব পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ইসলামের ভূমিকা

প্রকাশিত: ০৬. জুন. ২০২০ | শনিবার

হাফেজ মাওলানা মুফতি ওসমান আল উখিয়াভী
সিনিয়র মুহাদ্দিস
জামিয়া ইসলামিয়া বাইতুল কারীম
হালিশহর চট্টগ্রাম
আজ বিশ্ব পরিবেশ দিবস। ১৯৭২ সালের এই দিনে সুইডেনের স্টকহোমে ‘জাতিসংঘ মানব পরিবেশ সম্মেলন’ শুরু হয়। ১৯৭৩ সালে জাতিসংঘ সম্মেলনের প্রথম দিনটিকে বিশ্ব পরিবেশ দিবস হিসেবে ঘোষণা দেয়। এরপর থেকে জাতিসংঘের মানবিক পরিবেশ সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সম্মেলনে গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচির (ইউএনইপি) উদ্যোগে প্রতিবছর বাংলাদেশসহ বিশ্বের প্রায় ১৫০টি দেশে ৫ জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবস পালিত হয়। তবে এবারে করোনা মহামারিতে ভিন্ন এক প্রেক্ষাপটে পালিত হচ্ছে বিশ্ব পরিবেশ দিবস।

কোভিড-১৯ এর তাণ্ডবে সারাবিশ্বের মানুষ যখন বিপর্যস্ত তখন প্রকৃতিতে ফিরেছে প্রাণ। গত চার মাস ধরে পৃথিবীর মানুষ একপ্রকার ঘরবন্দি। প্রকৃতির ওপর চালানোর অবিচার কমে আসায় প্রকৃতি যেন নিজেকে মেলে ধরেছে। ফিরেছে স্বমহিমায়। এই বাস্তবতা থেকে নতুন করে শিখতে শুরু করেছে মানুষ। তবে সেই শিক্ষা করোনার পরও থাকবে কিনা এখন সেটিই দেখার বিষয়। চলতি বছর বিশ্ব পরিবেশ দিবসের মূল প্রতিপাদ্য টাইম ফর নেচার। অর্থাৎ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের এখনই সময়।
পরিবেশ সংরক্ষণে ইসলামের নির্দেশনা
ইসলামে যেমন ইবাদতের তাৎপর্য রয়েছে, তেমনি রয়েছে পরিবেশের গুরুত্ব। কোন পরিবেশে বসবাস করলে মানুষের সুবিধা হবে বা মানুষ সুন্দরভাবে বেঁচে থাকতে পারবে, ইসলাম তা সুনিশ্চিত করেছে। আমাদের চারপাশে যা কিছু আছে; যেমন গাছপালা, বাড়িঘর, মাটি, পানি, বায়ু, জীবজন্তু, পশুপাখি, রাস্তাঘাট, নদীনালা, পাহাড়-পর্বত, যানবাহন, কলকারখানা ইত্যাদি নিয়েই পরিবেশ। এগুলো সবই মহান আল্লাহর শ্রেষ্ঠ নেয়ামত। এরশাদ হচ্ছে ‘আমি পৃথিবীকে বিস্তৃত করেছি এবং এতে পর্বতমালা সৃষ্টি করেছি। আমি পৃথিবীতে প্রতিটি বস্তু সুপরিমিতভাবে সৃষ্টি করেছি। এতে তোমাদের জন্য জীবিকার ব্যবস্থা করেছি। আর তোমরা যাদের জীবিকাদাতা নও, তাদের জন্যও। প্রতিটি বস্তু ভান্ডার আমার কাছে রয়েছে। আমি তা প্রয়োজনীয় পরিমাণে সরবরাহ করে থাকি। আমি বৃষ্টিগর্ভ বায়ু প্রেরণ করি। এরপর আকাশ থেকে মুষলধারে বৃষ্টি বর্ষণ করি। তা তোমাদের পান করতে দিই। এর ভান্ডার তোমাদের কাছে নেই।’ (সুরা হিজর : ১৯-২২)
অতএব, মানুষের দায়িত্বের সঙ্গে আছে তার পরীক্ষা। এটা এমন এক কর্তব্য, যা হলো যাবতীয় কাজকর্ম সুষ্ঠু-সঠিক ও প্রশংসনীয় হওয়ার বিষয় নিশ্চিত করা। এই কাঠামোর আওতায় অনুসন্ধান ও অনুধাবন করা যায় পরিবেশের যত্ন নেয়ার জন্য হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর দর্শনকে। জীবনধারণের উপায় উপকরণগুলো সর্বশক্তিমান আল্লাহর দেয়া নিয়ামত। আমরা যে পানি পান করি আর যে বাতাসে শ্বাস নিই তা এর দৃষ্টান্ত। কারণ পানির স্বাদ তো তিক্তও হতে পারতো। আর বাতাস হতে পারতো বিষাক্ত ধোঁয়া যাতে শ্বাস নেয়া অসম্ভব হয়ে দাঁড়াতো।
বিশ্ব সভ্যতাকে ইসলাম যে শিক্ষা দিয়েছেন
বিশ্বব্যাপী চলছে পরিবেশ বিপর্যয়ের হাত থেকে পরিত্রাণের উপায় ও পন্থা উদ্ভাবনের নিরলস প্রচেষ্টা। কানাডার মন্ট্রিল চুক্তি, ব্রাজিলের রিওডি জেনিরো আর্থ সামিট ১৯৯২, মেক্সিকোর কানকুন ধরিত্রি সম্মেলন তারই অংশ বিশেষ। জনগণকে পরিবেশ বিষয়ে সচেতন করে তোলার জন্য সংশ্লিষ্ট দেশের সরকার বিভিন্ন সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, গবেষণা, বিজ্ঞাপন প্রভৃতিতে কোটি কোটি টাকা খরচ করছে। এমনকি প্রত্যেক বছরের ৫ জুন পরিবেশ দিবস হিসেবে পালন করছে বিশ্ববাসী। এর ফলে বন ও পরিবেশ বিষয়ক একটি পৃথক মন্ত্রণালয় গঠিত হয়েছে এবং এটি একটি স্বতন্ত্র সাবজেক্ট হিসেবে ইউনিভার্সিটির পাঠ্য করা হয়েছে। অথচ ভাবতেই অবাক লাগে যে আজকের যুগে সৃষ্ট পরিবেশ বিপর্যয় ও দূষণের মত একটা বিরাট সমস্যাকে প্রায় দেড় হাজার বছর পূর্বে ইসলাম অনুভব করেছে এবং এর সংরক্ষণ তথা সমাধানের উপায়ও বলে দিয়েছে।
পরিবেশ সম্পর্কে আজকের মানুষ যতটুকু জ্ঞান রাখে তার ছিটে ফোটাও যখন ছিল না সেই পূঁতিগন্ধময় পরিবেশের আবরণ ভেদ করে যিনি ঊষার আলো ছড়ালেন তিনিই আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মদ (সা.)। উম্মী নবী কুরআনুল কারীমের শিক্ষার আলোকে নিজের অনুপম চরিত্র ও আদর্শের মাধ্যমে বিশ্ব বিবেককে জানালেন পরিবেশ সংরক্ষণের কৌশল, দীক্ষা দিলেন সুস্থ ও সুন্দর পরিবেশ গঠনের। বৃক্ষ রোপনকে সদকায়ে জারিয়া ঘোষণা দিলেন, মক্কা ও মদীনার বিশেষ এলাকাকে সংরক্ষিত এলাকা হিসেবে ঘোষণা করে উদ্ভিদ গাছপালা কর্তন এবং জীব জন্তু হত্যা নিষেধ করে পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় তার দূর দৃষ্টিরই পরিচয় দিয়েছিলেন । যখন মানুষের কল্পনায় পশু ক্লেশ নিবারণ সমিতির কথা উদ্ভব হয়নি তখন মহানবী (সা.) জীব জন্তুকে কষ্ট থেকে নিষ্কৃতি দিতে মানব জাতির দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন “সওয়ারীর পশু ক্লান্ত হয়ে গেলে তার উপর থেকে নেমে পড়”। রাসূল সা.’র প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতা আজকের আধুনিক বিশ্বেও বিস্ময়কর! আল্লাহ প্রদত্ত গাইড বুক আল-কুরআনের মাধ্যমে তিনি যে নৈতিক বিপ্লব সাধন করেছিলেন যা পরিবেশ সংরক্ষণের নিয়ামক শক্তি, তা আজকাল শুধু নয়, কিয়ামত পর্যন্ত পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় পথ নির্দেশ দানে সক্ষম।
মুমিনের করনীয়
এখন মানুষের কর্তব্য এসব যোগ্যতা কাজে লাগিয়ে সৃষ্টি জগতের রহস্য ও গূঢ়তত্ত্ব নিয়ে গবেষণা করা, কোরআন মজিদের ৭৫৬টি আয়াতে আল্লাহতায়ালার কুদরতের নিদর্শনাবলি নিয়ে গবেষণার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। মানুষ এসব নিয়ে যখন চিন্তা-গবেষণা করবে, তখন যেমন তার আল্লাহতায়ালার কুদরত ও অসীম ক্ষমতার প্রতি ঈমান মজবুত হবে, তেমনি মাখলুকাতের প্রতি তার দায়িত্ব ও কর্তব্যের উপলব্ধি জন্ম নেবে এবং প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্ক সুন্দর হবে। তৃতীয়ত. সৃষ্টিকুলের রহস্য ও সূক্ষ্মতত্ত্ব নিয়ে গবেষণা করলে নিজের কর্তব্য স্থির হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কল্যাণ ও সাফল্যের পথ অবলম্বন করাও তার জন্য সহজ হবে। চতুর্থত. যে বুঝতে পারবে পৃথিবীতে যত প্রাকৃতিক সম্পদ রয়েছে, তার মালিক আল্লাহ তায়ালা। মানুষের কাছে তা আমানত মাত্র।
ইসলামী স্কলারদের অভিমত হলো, পরিবেশ সংরক্ষণে ইসলামের অনন্য নির্দেশনাগুলো বাস্তবায়ন করলে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা পেয়ে একটি সুস্থ পরিবেশ বিশ্বব্যাপী গড়ে উঠবে ইনশালল্লাহ।

লেখক : সম্পাদক, আলোর খেয়া।

ফেসবুক থেকে কমেন্ট করুন।
Share Button

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ৫২ বার

Share Button